Monday, December 2, 2013

৩০ জেলায় নৈরাজ্য

রাজধানীর বাইরে ভেঙে পড়ছে প্রশাসন


1 
রাজশাহীতে অবরোধে বাধাদানকারী পুলিশের ওপর লাঠি ও গুলতি নিয়ে চড়াও ১৮ দলের কর্মীরা (ওপরে বাঁ থেকে), সাতক্ষীরায় গাছ কেটে ও রাস্তা খুঁড়ে সড়ক অবরোধ।(নিচে) রাজশাহীর সিটি বাইপাস মোড়ে পুলিশ ঠেকাতে পেট্রলবোমা ছোড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ১৮ দলের দুই কর্মী।ছবি : সালাহ উদ্দিন
রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬টি জেলার মধ্যে ১১টির বাসিন্দাদের দূরের যাত্রাপথ বগুড়ার মধ্য দিয়ে। মহাসড়ক ধরে উত্তরের ওই সব জেলা দিয়ে রাজধানী এবং দক্ষিণ, পশ্চিম বা পূর্বের জেলাগুলোতে পণ্য ও যাত্রী পরিবহন অসম্ভব হয়ে পড়ে যদি কোনো একটি স্থান আটকে দেওয়া যায়। বিরোধী জোটের চলমান অবরোধে ঠিক এ ঘটনাই ঘটছে। উত্তরের বিভিন্ন জেলায় অবরোধ কমবেশি পালিত হলেও বগুড়ায় কঠোর কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি ও তাদের জোটভুক্ত দলগুলোর কর্মীরা। বগুড়ার আশপাশে মহাসড়ক অবরোধ করে, রেললাইন উপড়ে ফেলে ওই ১১ জেলার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে সরকারবিরোধীরা।
বগুড়ার মতো দেশের বিভিন্ন জেলায় বিএনপি ও জামায়াতের শক্ত ঘাঁটি আছে। ওই সব এলাকায় মহাসড়ক অবরোধ করে অচল করে দেওয়া হচ্ছে পুরো দেশ। সরকার রেলওয়ের মাধ্যমে যোগাযোগ সচল রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও একের পর এক নাশকতা রেলকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। একবার রেললাইন তুলে ফেলার পর ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করে সেটি চালু করা হচ্ছে। পরের দিনই একই রেললাইনের আরেক জায়গায় নাশকতা চালিয়ে অচল করে দেওয়া হচ্ছে।
নাশকতাকারীরা নিয়মিত তাদের কৌশল পাল্টাচ্ছে। তাদের মূল কৌশল চোরাগোপ্তা হামলা হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি নাকশতা করার পর অপরাধীরাও থাকছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। পুলিশের পক্ষে তাদের ধরা সম্ভব হচ্ছে না। আবার আইনশৃঙ্খলারক্ষীর সংখ্যাও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। অন্যদিকে বিএনপি-জামায়াত অধ্যুষিত এলাকায় আসামি ধরতে গিয়ে স্থানীয় জনতার প্রতিরোধের মুখে পড়ছে পুলিশ।
দেশে পুলিশের সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। এর মধ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে (ডিএমপি) ২৬ হাজার ৫০০ জন সদস্য কাজ করছেন। ঢাকায় কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতা আছে। র‌্যাবের ১২টি ব্যাটালিয়নের আট হাজার সদস্যের মধ্যে পাঁচটি ব্যাটালিয়নে তিন হাজার সদস্য কাজ করেন ঢাকায়। কড়া নিরাপত্তা দিয়ে ঢাকাকে শান্ত রাখা গেলেও দেশের অন্যান্য জেলার পরিস্থিতি ভিন্ন।
পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, বিরোধী দলগুলোর ডাকা সাম্প্রতিক হরতাল-অবরোধে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে প্রায় ৩০টি জেলায় সহিংসতা বেশি হচ্ছে। ওই সব জেলার সরকার সমর্থকরা একেবারেই কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। সরকার সমর্থক নেতা-কর্মীদের হতাহতও করা হচ্ছে, বাড়িঘরে চালানো হচ্ছে ধ্বংসযজ্ঞ। গতকাল সোমবারও চাঁপাইনবাবগঞ্জে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া কানসাট আন্দোলনের নেতা গোলাম রাব্বানীর বাড়িতে আগুন দেয় অবরোধকারীরা। এতে একজনের মৃত্যু হয়। আবার সরকার সমর্থকরাও প্রতিপক্ষকে হতাহত করছে। ওই সব জেলার স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। কয়েকটি জেলার স্থানীয় প্রশাসন নিরাপত্তা চেয়ে ঢাকার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চিঠিও দিয়েছে।
গত ২৫ নভেম্বর দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন থেকে অবরোধের ডাক দেয় বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট। প্রথম দফায় ২৬ নভেম্বর থেকে ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত ৭১ ঘণ্টার অবরোধ পালন করা হয়। এরপর দ্বিতীয় দফার অবরোধ শুরু হয় ৩০ নভেম্বর থেকে। গতকাল সকালে সেই অবরোধ আগামী বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে বিএনপির পক্ষ থেকে।
অবরোধ বা হরতালের ঘোষণা এলেই দূরপাল্লার সব পরিবহন বন্ধ করে দেন মালিকরা। আন্তজেলা বাস বন্ধ থাকে। চলে শুধু নৌযান আর ট্রেন। নৌপথে অবরোধ কর্মসূচি পালন করার সুযোগ কম। তবে নৌপথেও ইদানীং অনেক মালিক লঞ্চ চালাচ্ছেন না। আবার খুব কম সংখ্যক জেলার সঙ্গে নৌ-যোগাযোগ আছে। অন্যদিকে বিমান অবরোধের আওতার বাইরে। কিন্তু হামলার সহজ শিকার হচ্ছে ট্রেন। গত ১১ মাসে রেলে ২৫০টি নাশকতার ঘটনা ঘটানো হয়েছে। সর্বশেষ চলতি অবরোধ কর্মসূচিতে কুমিল্লা, রাজশাহী, রাজবাড়ী, নাটোর, চট্টগ্রাম ও চাঁদপুরে রেললাইন উপড়ে ফেলা ও ফিশপ্লেট খুলে ফেলায় দুর্ঘটনা হয়েছে। বিভিন্ন জেলার সঙ্গে দীর্ঘ সময় রেল যোগাযোগও বন্ধ ছিল।
১০ জেলায় নাশকতা বেশি : গত কয়েক মাসের হরতাল ও সাম্প্রতিক অবরোধের চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিএনপি ও জামায়াতের শক্ত ঘাঁটি আছে এমন ১০টি জেলায় অবরোধ কর্মসূচি কঠোরভাবে পালন হচ্ছে। এসব জেলায় সহিংসতার ঘটনা বেশি ঘটছে। এ জেলাগুলো হল- বগুড়া, সাতক্ষীরা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, লালমনিরহাট, সিরাজগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, কুমিল্লা ও জয়পুরহাট। এসব জেলায় পুলিশের ওপর হামলা, বিজিবি সদস্যকে হত্যা, রেললাইন উপড়ে ফেলাসহ প্রতিপক্ষের ওপর হামলার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। 
উত্তরবঙ্গের ১৬ জেলার মধ্যে বগুড়া সীমান্তের মহাসড়কেই তাণ্ডবের চিত্র সবচেয়ে বেশি। ১৮ দলীয় জোটের নেতা-কর্মীরা রীতিমতো ব্যারিকেড দিয়ে দেশের অন্যান্য জেলা থেকে বগুড়াকে বিচ্ছিন্ন করে রাখেন। একই অবস্থা রেলপথেও। বগুড়া রেলস্টেশনের অদূরে শহরদীঘি ও সাবগ্রাম এলাকায় রেললাইন বারবার উপড়ে ফেলা হয়। মাত্র এক মাসে ওই দুই স্থানে ছয়বার নাশকতার চেষ্টা চালানো হয়।
দেশের অর্থনীতির পাইপলাইন বলা হয় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে। প্রায় ২৪২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এই মহাসড়কটির চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলা অংশের মাত্র ৪০ কিলোমিটার সড়কে দুর্বৃত্তরা গত সাত মাস ধরে গাড়ি ভাঙচুর করছে ও পোড়াচ্ছে। নভেম্বর মাসে নাশকতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় শুধু সীতাকুণ্ডেই র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবির সাড়ে পাঁচ শতাধিক ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছিল। চলতি অবরোধে ওই মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকায় দেশের অর্থনীতি অচল হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী দুই জেলা ঝিনাইদহ ও সাতক্ষীরায় গত ফেব্র“য়ারি মাসে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির আদেশের পর থেকে হরতাল অবরোধে এ পর্যন্ত ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একজন পুলিশ সদস্য। এর মধ্যে সাতক্ষীরায় মারা গেছে ১৯ জন ও ঝিনাইদহে ৪ জন। এ সময় হরতাল-অবরোধ সফল করার জন্য জামায়াত-বিএনপি কর্মীরা হাজার হাজার সরকারি গাছ কেটেছে। সাতক্ষীরায় নাশকতাকারীরা সড়ক-মহাসড়ক কেটে জেলাকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে।
হরতাল-অবরোধে প্রায় প্রতিদিনই সংবাদপত্রের পাতায় উঠছে উত্তরের জেলা লালমনিরহাটের নাম। এই সময়ে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েতে নাশকতার আশঙ্কায় জারি করা বিশেষ সতর্কতা (রেড অ্যালার্ট) চলা অবস্থাতেই লালমনিরহাট রেলওয়ে বিভাগের আওতায় থাকা বিভিন্ন রুটে ছোট-বড় মিলিয়ে ৯টি নাশকতার ঘটনা ঘটেছে।
সহিংসতা বেশি হওয়া ১০ জেলা ছাড়াও আরো প্রায় ২০টি জেলায় অবরোধকারীরা বেশি সক্রিয় থাকছে। পাবনা, নোয়াখালী, দিনাজপুর, ঝিনাইদহ, গাইবান্ধা, নাটোর, চাঁদপুর, লালমনিরহাট, সিলেট, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফেনী, যশোর, বরিশাল, মুন্সীগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় অবরোধকারীরা।
প্রশাসন ও পুলিশ অসহায় : দেশে রেললাইনের দৈর্ঘ্য দুই হাজার ৮৩৫ কিলোমিটার। আর মহাসড়কের দৈর্ঘ্য প্রায় ২১ হাজার কিলোমিটার। এত দীর্ঘ পথে কড়া নিরাপত্তা বসানো পুলিশ বা অন্য কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে কঠিন। বিভিন্ন বাহিনী মিলিয়ে এখন রেলপথের নিরাপত্তায় ৬৫ হাজার সদস্য কাজ করছেন। কিন্তু তার পরও রেললাইনে নাশকতা ঠেকানো যাচ্ছে না। মহাসড়কে যানবাহন চলছে না, আন্তজেলা বাসও চলাচল বন্ধ থাকছে অবরোধে। এমনকি ফরিদপুরের মতো আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত এলাকায়ও আন্তজেলা বাস চলছে না।
র‌্যাবের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী দেশের জনসংখ্যা ও পুলিশের সদস্য সংখ্যার অনুপাত ১২০০ঃ১। অর্থাৎ প্রতি এক হাজার ২০০ জন মানুষের নিরাপত্তার জন্য একজন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশেই জনসংখ্যার তুলনায় পুলিশের সংখ্যা কম। ভারতে প্রতি ৭২৮ জনের জন্য একজন, পাকিস্তানে ৬২৫ জনের জন্য একজন, থাইল্যান্ডে ২২৮ জনের জন্য একজন পুলিশ রয়েছে।
দেশে বিজিবির সদস্য সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। এর মধ্যে সদর দপ্তর পিলখানায় আছেন পাঁচ হাজারের মতো সদস্য। বাকিরা সীমান্তে দায়িত্ব পালন করেন। তবে অবরোধ-হরতালে সহিংসতাপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিজিবি মোতায়েন করা হয়। দেশের ১৫টি সেক্টরের প্রতিটিতে এক হাজারের মতো বিজিবি সদস্যকে এ কাজে লাগানো যায়।
পুলিশ-বিজিবি দিয়ে সব স্থানে নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। যেখানে নিরাপত্তার ঘাটতি আছে সেখানেই হামলা করছে অবরোধকারীরা। বগুড়া শহরের অভ্যন্তরে ও মহাসড়কে নাশকতা বাড়লেও পুলিশের ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সাধারণ মানুষ। শহরের সাতমাথা এলাকার ব্যবসায়ী আব্দুল মান্নান বলেন, পুলিশ এখন নিজেদের রক্ষায় ব্যস্ত। পুলিশের সামনেই বিভিন্ন স্থানে হামলা ও জ্বালাও-পোড়াও হচ্ছে। তারা দেখেও না দেখার ভান করে থাকছে। এমনকি বিভিন্ন স্থানে পুলিশের ওপর হামলা হলেও হামলাকারীদের গ্রেপ্তারে কোনো অভিযান নেই।
পুলিশ সুপার মোজাম্মেল হক জানান, সীমিত পুলিশ দিয়ে সব স্থানে নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়। এ কারণে মূল পয়েন্টগুলোতে নিরাপত্তা রাখা হয়েছে। তিনি জানান, হামলাকারীরা চিহ্নিত হলে অবশ্যই তাদের গ্রেপ্তার করা হবে।
ওদিকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গ্রামগঞ্জে রাজনৈতিক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। ক্যাডাররা বেপরোয়া হয়ে নৃশংসভাবে প্রতিপক্ষকে হামলা করছে। হাত-পায়ের রগ কেটে দিচ্ছে। বাড়িঘর আগুনে পুড়িয়ে দিচ্ছে। গত মাসের তিন দিনের আর গত শনিবারের অবরোধে ক্যাডারদের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছে ছয়জনকে। তাদের মধ্যে দুজন আওয়ামী লীগের, তিনজন জামায়াতের আর একজন গৃহবধূ। এ ছাড়া সংঘর্ষের ঘটনায় আহত হয়েছে ইউএনও, পুলিশসহ ১৫০ জন। তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এ পরিস্থিতিতে সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট জেলার ডিসিরা নিরাপত্তা চেয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে চিঠি দিয়েছেন। জেলা প্রশাসকরা নিজেদের নিরাপত্তার পাশাপাশি থানার নিরাপত্তাও চেয়েছেন।
রাজশাহীতে আন্দোলন বা হরতালের নামে নাশকতা অব্যাহত রয়েছে। নতুন নতুন অপরাধী যুক্ত হয়ে পড়ায় পুলিশের পক্ষে তাদের শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। রাজশাহী পুলিশের উপকমিশনার (সদর) শাহ গোলাম মাহমুদ শেখ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাজনৈতিক আন্দোলনের নামে সাম্প্রতিক সময়ে রাজশাহীতে নাশকতা বা সহিংসতার ঘটনা বেড়েই চলেছে। এগুলো প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় আছে। তার পরও মাঝেমধ্যেই কিছু কিছু ঘটনা ঘটছে।’ তিনি বলেন, ‘নাশকতা বা সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে নতুন নতুন অপরাধী। আমরা তাদের ভিডিও ফুটেজ দেখে চিহ্নিত করছি। সেই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দেওয়া হচ্ছে মামলা। চালানো হচ্ছে গ্রেপ্তার অভিযান।’
নিয়মিত কৌশল পরিবর্তন, অপরাধীরা লাপাত্তা : অবরোধ ও সহিংসতাকারীরা নিয়মিত কৌশল পাল্টানোয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে পুশিল ও অন্যান্য বাহিনী। কোনো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পুলিশি পাহারা বসানো হলে অন্য জায়গায় হামলা করছে নাশকতাকারীরা। রাতের আঁধারে পরিকল্পিতভাবে তারা রেললাইন উপড়ে ফেলছে। মানুষকে ডেকে নিয়ে আগুন দিচ্ছে। মুখে গামছা বেঁধে হঠাৎ পেট্রল ঢেলে যানবাহনে আগুন দিয়ে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ায় তাদের শনাক্ত করাও সম্ভব হচ্ছে না পুলিশের পক্ষে।
লালমনিরহাটে মামলাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় আন্দোলনকারীরা জেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে খুব একটা অবস্থান নিতে না পেরে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান নিয়ে আন্দোলন-সহিংস ঘটনা ঘটাচ্ছে। জেলার পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান গতকাল সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুর্বৃত্তরা অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় সুযোগ বুঝে আচমকা সহিংস ঘটনা ঘটাচ্ছে। অবশ্য আমরা প্রতিটি বিষয়েই আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি।’
বগুড়ায় রেললাইনে একেক দিন একেক জায়গায় নাশকতার কারণে রেলযোগাযোগ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। নিরাপত্তা বাড়ানো হলেও ফাঁকফোকর খুঁজে ঠিকই রেললাইনের ক্ষতি করছে নাশকতাকারীরা। রেলওয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বগুড়ায় গত কয়েক মাসে বিভিন্ন স্থানে নাশকতার উদ্দেশ্যে সাড়ে পাঁচ হাজার রেলক্লিপ খুলে ফেলে রাখে জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীরা। সর্বশেষ অবরোধে একইভাবে বগুড়া শহরের শহরদীঘি ও সাবগ্রাম এলাকায় রেললাইনের প্রায় ৭২ ফুট কেটে ফেলা হয়।
ঢাকায় পুলিশ ও গোয়েন্দাদের তৎপরতার কারলে চোরাগোপ্তা হামলার আশ্রয় নিয়েছে নাশকতাকারীরা। পুলিশের নিরাপত্তা যেখানে একটু কম থাকছে, সেখানেই হামলা করা হচ্ছে। কয়েক মাস আগে মিরপুর, কারওয়ান বাজারসহ চিহ্নিত কয়েকটি স্থানে শিবিরের মিছিল ও হামলার ঘটনা ঘটত। এখন মিছিল থেকে হামলা না করে ককটেল ও পেট্রলবোমা ব্যবহার করছে নাশকতাকারীরা। ঢাকার কয়েকটি স্থানে সীমাবদ্ধ না থেকে তারা পুরো ঢাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। 
আগে থেকে সাংবাদিকদের ডেকে নিয়ে গলির মধ্যে মিছিল ও ককটেল ফাটানোর কৌশলটি পুরনো হয়েছে ঢাকায়। এখন দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপির নেতা-কর্মীরা সেটির ব্যবহার শুরু করেছে। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের দেখাতে এমনটি করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
যাত্রী সেজে গাড়িতে উঠে আগুন দেওয়ার কৌশলও নিচ্ছে অবরোধকারীরা। গাজীপুরের পুলিশ সুপার আব্দুল বাতেন জানান, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হরতাল সমর্থকরা যাত্রী সেজে বাসে উঠে আগুন দিয়ে নেমে যায়। গাজীপুরে অসংখ্য বহিরাগতের বাস। তারা কারখানায় চাকরিসহ নানা কাজে গাজীপুরে বাস করে। অপরাধীরা নাশকতা করে দ্রুত সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যায়।
[প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন কালের কণ্ঠের বগুড়ার নিজস্ব প্রতিবেদক লিমন বাসার, গাজীপুরের নিজস্ব প্রতিবেদক শরীফ আহমেদ শামীম, যশোরের নিজস্ব প্রতিবেদক ফখরে আলম, রাজশাহীর নিজস্ব প্রতিবেদক রফিকুল ইসলাম ও লালমনিরহাট প্রতিনিধি হায়দার আলী বাবু]
- See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2013/12/03/26794#sthash.FgXd0u9L.dpuf

0 comments:

Post a Comment