Monday, December 2, 2013

জাতিসংঘের দিকে তাকিয়ে বিএনপি

নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে সমঝোতার জন্য এখন জাতিসংঘের দিকে তাকিয়ে আছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। সর্বোচ্চ ছাড় দিয়ে হলেও সরকারের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে চায় বিএনপি ও এর নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট। কতটা ছাড় দিলে আলোচনা ফলপ্রসূ হবে এবং কী পদ্ধতিতে জাতিসংঘকে কাজে লাগিয়ে সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা যায়, সেই কৌশল নিয়ে বিএনপি নেতাদের মধ্যে আলোচনা চলছে। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।
জাতিসংঘের রাজনীতিবিষয়ক সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো আগামী ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সফরে আসছেন। এ সফরের সময় তিনি সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক করবেন। দলীয় সূত্রে জানা যায়, ওই বৈঠক সামনে রেখে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা প্রয়োজনীয় হোমওয়ার্ক সেরে নিচ্ছেন। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট নেতারা দফায় দফায় বৈঠকও করছেন। আর সব বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, কতটা ছাড় দিলে আলোচনা ফলপ্রসূ হবে এবং কী পদ্ধতিতে জাতিসংঘসহ সব বিদেশি ডেলিগেশনকে কাজে লাগিয়ে সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা যায়, এর কৌশল নিয়ে প্রয়োজনীয় হোমওয়ার্ক করছেন বিএনপি নেতারা। দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মোবাইল ফোন বন্ধ থাকলেও গুলশানে দলীয় চেয়ারপারসনের বাসভবনে গিয়ে বেশ কয়েকজন নেতা নিয়মিত তাঁর সঙ্গে দেখা করছেন। দলের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করছেন তাঁরা। গত রবিবার রাতেও দেখা করেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবিহউদ্দিন আহমেদ, মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহি আকবরসহ কয়েকজন।
সূত্রগুলো জানায়, দলের বেশির ভাগ সিনিয়র নেতা পলাতক থাকায় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, ভাইস চেয়াম্যান শমসের মবিন চৌধুরী, উপদেষ্টা ড. ওসমান ফারুক, সাংবাদিক শফিক রেহমানসহ কয়েকজনকে এ বিষয়ে কাজ করতে নির্দেশ দিয়েছেন খালেদা জিয়া। প্রকাশ্যে কিছু না বললেও বিএনপির ওই নেতারা প্রায়ই বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর সঙ্গে আলোচনার জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাব তৈরি করছেন তাঁরা। সর্বোচ্চ ছাড় দিয়ে হলেও সংকট সমাধানের লক্ষ্যে তৈরি করা ওই প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করেই আলোচনা করবেন বিএনপি নেতারা। তাঁরা প্রস্তাবগুলো তারানকোসহ অন্যদের কাছে তুলে ধরবেন। বিএনপি নেতারা মনে করছেন, নির্বাচন সামনে রেখে কূটনীতিকরা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে এবার প্রস্তাবগুলো সরকারকে জানাবেন।
জানা যায়, এ প্রস্তাব তৈরির বিষয়ে ড. আব্দুল মঈন খানের নেতৃত্বে দলের কয়েকজন নেতা গুলশানে একটি বাসায় গতকাল সোমবার বৈঠক করেছেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বিষয়টি স্বীকার করে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সংকট নিরসনের জন্য আমরা সব ধরনের আলোচনাই চালিয়ে যাচ্ছি। সরকারের সঙ্গেও এ বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। জাতিসংঘের প্রতিনিধিদল আসার আগেও ফলপ্রসূ আলোচনা হতে পারে। যদি তা না হয় তাহলে জাতিসংঘের মাধ্যমে আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু তুলে ধরব।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা সকলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে অংশ নিতে চাই। এ জন্য কী করতে হবে সে বিষয়গুলো আলোচনায় থাকবে।’
এ প্রসঙ্গে বিএনপির আরেক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, সরকারের একদলীয় নির্বাচনের উদ্যোগকে জাতিসংঘ কখনো স্বীকৃতি দেবে না। এই পরিস্থিতির উত্তরণ ও সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ মধ্যস্থতা করবে। এ জন্য জাতিসংঘ চেষ্টাও করছে। বিশেষ করে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর সফরের দিকে আমরা তাকিয়ে আছি। তাঁর চলতি সফরে সমাধান হোক তা আমরা চাই। আর যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে জাতিসংঘ সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করবে বলেও আমাদের বিশ্বাস।’
ওই নেতার মতে, তারানকোর আসন্ন সফরের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। জাতিসংঘের অবস্থান জানার ওপর বিএনপির আগামী দিনের আন্দোলনের কর্মসূচি নির্ভর করছে। সমঝোতা হলে নির্বাচনের দিনক্ষণ পেছাতে পারে বলেও জানান তিনি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সংঘাতের বিপক্ষে। কিন্তু সরকার আমাদের বাধ্য করেছে রাস্তায় নামতে। ক্রমান্বয়ে দেশ সংঘাতের দিকে যাচ্ছে। আমরা আগেও বলেছি, এখনো বলছি- আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করে সকলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হোক। সে বিষয়টিই আমরা জাতিসংঘের প্রতিনিধির কাছে তুলে ধরব।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের রাজনৈতিক চলমান সংকট আমাদেরই সমাধান করতে হবে। তার পরও এখন বিশ্বায়নের যুগ, সকলেরই বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ রয়েছে। এ জন্য জাতিসংঘের প্রতিনিধিদলসহ কয়েকটি বিদেশি উচ্চপর্যায়ের ডেলিগেশন বাংলাদেশে আসছে। আশা করি, চলমান সংকট নিরসনে তারা তাদের মতবাদ ব্যক্ত করবে। আমরাও আমাদের বক্তব্য উপস্থাপন করব।’
বিএনপির অন্য এক নেতা জানান, বর্তমান সরকার যেভাবে একতরফা নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে, তাতে দেশে সংঘাত ছাড়া বিকল্প কিছু নেই। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে দেশে আন্দোলন হতো না। সরকার ইচ্ছা করে দেশবাসীকে আন্দোলনে নামাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘সারা দেশে টানা অবরোধ পালন করছে দেশের সাধারণ মানুষ। বিদেশিরাও চায় গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। তাই বিদেশি কেউ আসলে, তারা আমাদের সঙ্গে বৈঠক করলে স্বাভাবিকভাবেই দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হবে।’
সূত্র জানায়, জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো বাংলাদেশ সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। দেশের চলমান রাজনৈতিক সংকট উত্তরণের উপায় নিয়ে তিনি কথা বলবেন। এ ছাড়া ভারতের পররাষ্ট্রসচিব সুজাতা সিং আসছেন ৪ ডিসেম্বর। যুক্তরাজ্যের কমনওয়েলথ ও ফরেন অফিস-বষয়ক সিনিয়র প্রতিমন্ত্রী সাঈদা ওয়ার্সির ঢাকায় আসার কথা ১২ ডিসেম্বর। এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকজন পার্লামেন্টারিয়ানেরও ঢাকা সফর করার কথা রয়েছে। ইউরোপের পার্লামেন্ট সদস্যরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠানো হবে কি না সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।

0 comments:

Post a Comment